সত্যিই, লাইফ কী ভীষণভাবে রং পাল্টায়!

মেয়েটার সাথে ছেলেটার সাত বছরের রিলেশন ছিল। মেয়েটা আমাদের ডিপার্টমেন্টেই পড়তো। নাম মোহনা।

ভাইয়ের নাম ছিল শামস। আমাদের হলেই থাকতেন। তিন ব্যাচ সিনিয়র। উনাকে কোনদিন হাসি ছাড়া দেখিনি। এত ভদ্র ছেলে পুরো ক্যাম্পাসে পাওয়া দুষ্কর ছিল। মেয়েটাকে ভালোও বাসতেন পাগলের মতো। প্রায়ই দেখা যেতো ক্যাম্পাসে হাতে হাত রেখে হেটে চলেছেন দু’জনে। আমাদের চোখে চোখ পড়তেই অবশ্য হাত ছেড়ে দিয়ে লাজুক হাসি দিতেন শামস ভাই!
মাঝে মাঝেই রাত তিনটা-চারটায় ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, হলের করিডোরের এক কোনায় দাঁড়িয়ে ভাই তখনও গুজুর গুজুর করেই চলেছেন!

একটা চাকরির অভাবে সেই সম্পর্কটাই বদলে গেল কী ভীষণভাবে!

ততদিনে ভাইয়ের মাস্টার্স পাস করা শেষ। চাকরি পাচ্ছেন না বলে হলে থেকে গিয়েছিলেন আরও দেড় বছরের মতো। মেয়েটা ছেড়ে চলে গিয়েছিল মাস্টার্স শেষের এক বছরের মাথায়। যাবেই না বা কেন, সুন্দরী মেয়ে, বাসায় বিয়ের প্রস্তাব এসেছে, সেই ছেলে আবার প্রসাশনের ক্যাডার।

→যাওয়ার আগে মেয়ে বলে গিয়েছিল, “চাকরি পাও না, যোগ্যতা নেই, তো প্রেম করতে এসেছিলে কেন?”

ব্রেকাপের পর ভাই প্রায়ই আমার রুমে আসতেন সিগারেট খেতে। হাতে সব সময় কোনো না কোনো বিসিএসের বই থাকতই। ঘন্টার পর ঘন্টা ধোঁয়া ছাড়তেন আর মাঝেমাঝে উনার জীবনের গল্প বলে চলতেন। বাড়ির রান্না ঘরের কোণাটা ভেঙে পড়েছে, বড় বোনটার বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে, বাপ আবার পেনশনে গেছে এই বছর ইত্যাদি। মাঝেমাঝে কথা বলা বন্ধ করে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কি যেন ভাবতেন। হয়তো সে ভাবনা আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে!

মাস্টার্সের দেড় বছরের মাথায় শামস ভাইকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। বের করে দিয়েছিল তাঁরাই, যারা শামস ভাইয়ের হেল্প পেতে পেতে এতদূর এসেছে, যাদের হলে ব্যবস্থা করে দেয়েছিলেন শামস ভাই নিজেই।

যেদিন বেরিয়ে যান, অঝোর ধারায় চোখ থেকে পানি পড়ছিল। ভার্সিটিতে ক্লাস সেরে এসে দেখি, ভাই বের হয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমাকে দেখে চোখে পানি নিয়ে অনেক কষ্টে একটা হাসি দিয়ে বলেছিলেন, “আর যাই করিস, প্রেম করতে যাস না ভাই। জীবনটা ছাই বানিয়ে দেবে। “কথাটা কাগজে লিখে দেয়ালে টানিয়ে রেখেছিলাম!

উপরের কথাগুলো প্রায় বছর-দশক আগের।

ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত একটা কাজে বহুদিন ধরে চেষ্টা করছিলাম কোনো এক কাষ্টমস অফিসারের সাথে যোগাযোগ করতে, বিষেশত, ভার্সিটির কোনো বড় ভাইয়ের সাথে। তাহলে হেল্প বেশি পাওয়া যাই। খুঁজ খবর নিয়ে যা জানতে পারলাম, মাথা ঘুরে যাবার উপক্রম হলো। শামস ভাই এখন ঢাকা এয়ারপোর্টের নামী-দামী কাষ্টমস অফিসার!

সময় করে একদিন গেলাম ভাইয়ের অফিসে। চকচকে সেক্রেটারিয়েট টেবিলের একপাশে বসে ছিলেন ভাই, আমাকে দেখে বিশাল এক হাসি দিয়ে এগিয়ে এসে বুকে বুক মেলালেন। একথা সেকথার পর উঠল, সংসার জীবনের কথা। বললাম, বিয়েটা করিনি এখনো, বোহেমিয়ান জীবনই ভালো লাগছে। ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করতে বললেন, বিয়ে করেছেন। একটা ফুটফুটে বাচ্চাও হয়েছে। ভাবী আবার সলিমুল্লাহ মেডিকেলের ডাক্তার।

অনেকক্ষণ যাবৎ মনের সধ্যে একটা কথা বাজছিল; শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, “মোহনার কথা মনে পড়ে না, ভাই?” বেশ বড়সড় একটা হাসি দিয়ে বললেন, “নারেহ। জীবনে যা চেয়েছিলাম, তাঁর চেয়ে অনেক বেশি পেয়ে গিয়েছি। এখন আর এই সব ছোটখাট চাওয়াগুলো পাত্তা পায় না।”

জিজ্ঞেস করলাম, “মোহনার আর কোনো খবর পাননি?” কিছুক্ষন চুপ থেকে বললেন, “শুনেছিলাম বছরখানেক আগে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। এরপর আর কোনো খবর পাইনি।”

ভাইয়ার গাড়িতে এক সাথে ফেরার পথে ভাইয়ের বলা একটা কথা প্রায়ই কানে বাজে “লাইফে কাউকে ঠকাস নারেহ। লাইফ কাউকে ছাড় দেয় না, প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়ে। রিভেঞ্জ অফ নেচার!”

সত্যিই, লাইফ কী ভীষণভাবে রং পাল্টায়!

#সংগৃহীত
#love #sad #friends #অনুগল্প

Leave a Comment